মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি.
মানিকগঞ্জের সদর উপজেলাধীন ‘চরমত্ত সমবায় সমিতি’-এর বিরুদ্ধে ‘৭ বছরে টাকা দ্বিগুণ’ করার চটকদার ও লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ৫৩ লাখ টাকা আমানত সংগ্রহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দেশের প্রচলিত সমবায় আইন ও ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এই বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হলেও এর সঠিক হিসাব ও বিনিয়োগ নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সমিতির কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হওয়া, পিঠমোড়া করে বেঁধে মারধর এবং হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকির শিকার হয়েছেন এই প্রতিবেদক।
অস্বচ্ছ হিসাব ও ঋণ বিতরণে অনিয়ম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরমত্ত সমবায় সমিতিতে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সঞ্চয় ও আমানত হিসেবে প্রায় ৫৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হলেও আমানতকারীদের কাছে এর কোনো পর্যাপ্ত নথিভিত্তিক তথ্য নেই। এই অর্থ কোথায় ও কোন খাতে ব্যবহৃত বা বিনিয়োগ হয়েছে, কত টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে আর কত অংশ ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে- তার কোনো স্বচ্ছ ক্যাশবুক বা লেজার দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ উঠেছে, ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও রেজুলেশন ছাড়াই মোটা অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি সমবায় আইন তোয়াক্কা না করে সমিতির সদস্যবহির্ভূত ব্যক্তিদের সাথেও বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদ ও সার্ভিস চার্জ আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
সরেজমিনে চরমত্ত সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের সামনে টাঙানো সাইনবোর্ডটি ছেঁড়া অবস্থায় রয়েছে, যেখানে সমিতির নাম ও নিবন্ধন নম্বরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়।
আর্থিক অনিয়ম ও সদস্যবহির্ভূত লেনদেনের বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে কার্যালয়ে অবস্থানরত ম্যানেজার ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য কোনো প্রকার নথিপত্র দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে তারা প্রতিবেদকের সাথে চরম মারমুখী আচরণ করেন এবং কোনো তথ্য দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি সমিতির সভাপতি রিসাদ হোসেনকে জানানো হলে তিনি সমাধানের জন্য সময় চাইলেও দুই সপ্তাহেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। উল্টো নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমিতির কয়েকজন কর্মচারী জানান, আলমগীর, রবিউল, পিন্টু ও খোরশেদ নামের সমিতির কয়েকজন সদস্য ওই সাংবাদিককে পুনরায় কার্যালয়ে পাওয়া গেলে পিঠমোড়া করে বেঁধে তথ্যের উৎস (সোর্স) প্রকাশের জন্য চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। উৎস প্রকাশ না করলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উল্টো চাঁদা দাবির মিথ্যা অভিযোগ এনে মারধর ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এই গুরুতর হুমকির বিষয়ে সভাপতি রিসাদ হোসেনের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি তিন দিন পার হলেও কোনো কার্যকর জবাব বা সমাধান দিতে পারেননি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিককে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া ভীতি প্রদর্শনের এই ঘটনা দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৫০৩ ও ৫০৬ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এঘটনায় সাংবাদিককে হুমকির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চরমত্ত সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ওঠা এই আর্থিক জালিয়াতির প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত বিশেষ নিরীক্ষা (Special Audit) ও নথিপত্র যাচাইয়ের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

