বিপ্লব সাহা খুলনা ব্যুরো:
প্রশাসনের সাথে এক নিবিড় সখ্যতা রেখে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প, অবৈধভাবে সড়ক ও ফুটপাত দখল, যত্রতত্র পার্কিং, ট্রাফিক বিভাগের মদদে দিনরাত অবাধ বাধাহীন বাস-ট্রাকসহ বড় বড় গাড়ি চলাচল করছে। ফলে যানজট, শব্দ দূষণ, বায়ূ দূষণ, বেদখল ফুটপাত নিয়ে নগরীর দুর্ভোগের শেষ নেই। এতে হাজার হাজার মানুষের যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা শিকার হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, খুলনা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থাপনা, দখলদারদের দৌরাত্ম, নিয়ন্ত্রহীনভাবে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মহানগরী খুলনাও বাস অযোগ্য শহরে পরিণত হবে। নগর ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নিত্যদিনই দীর্ঘ যানজট লেগে থাকছে। নগরীর পিটিআই মোড়ের চারপাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার এবং ক্লিনিকের ভিড়ের মধ্যে সড়ক সংস্কারের কাজ চলার কারণে একপাশ সংকীর্ণ ও বন্ধ থাকায় রাস্তায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘসময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে একের পর এক গাড়ি চলতে থাকে। একই অবস্থা ময়লাপোতা মোড় থেকে সিটি মেডিকেল হাসপাতাল, গল্লামারি সেতু এলাকাতেও একই চিত্র। বছরের পর বছর ধরে নির্মাণকাজ চললেও গল্লামারী সেতুর কাজ শেষ হয়নি। একমুখী চলাচল ও অনিয়ন্ত্রিত টার্নিংয়ে যানজট আরও বেড়েছে। শুধু একটি বা দুটি স্থানে নয়, সোনাডাঙ্গা, শিববাড়ি, ডাকবাংলা মোড়, দৌলতপুরসহ অন্তত এক ডজন এলাকাতেই একই চিত্র। অপরদিকে, নগরীর অধিকাংশ ফুটপাত এখন দোকান, অস্থায়ী বসতি, গাড়ি পার্কিং এবং নির্মাণসামগ্রীর দখলে। এসব কারণে পথচারীরা সড়কের মাঝখান দিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একদিকে যেখানে সড়ক সংকট, অন্যদিকে ফুটপাতের অব্যবস্থাপনা নগরবাসীকে যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে। বিশেষ করে ক্লে রোড, কেডি ঘোষ রোড, সাইকেল ও খেলাধূলা মার্কেট সংলগ্ন সড়ক, সিমেট্রি রোড সড়কের উত্তর পার্শ্ব, ডাকবাংলো মোড় যেন ভাসমান মার্কেট। যান চলাচল তো দুরে থাক, পথচারীদের চলাচলই অসম্ভব। অভিযোগ উঠেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি শাখার এক কর্মকর্তার ইন্ধনে নগরীর বেশ কয়েকটি ফুটপাথ অসাধু চক্রের দখলে রয়েছে। স্থানীয় কতিপয় ব্যবসায়ী ও ওই কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজসে এই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে মাসোহারা পেয়ে থাকেন। মহানগরীর অন্যতম প্রবেশপথ গল্লামারী ব্রিজ সংলগ্ন লিনিয়ার র্পাকের সামনের অংশও সিটি করপোরেশনের ওই প্রভাবশালী চক্র দখল করে বাজার বানিয়েছেন।
খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, প্রতিদিন ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যায়। পিটিআই মোড় থেকে শিববাড়ি পর্যন্ত আসতে আধাঘন্টার বেশি সময় লেগে যায়, যেখানে সময় লাগার কথা মাত্র পাঁচ মিনিট।
ইজিবাইক চালক আব্দুল জলিল বলেন, যানজটের কারণে এক ঘণ্টায় তিনটা ট্রিপও দিতে পারি না। দিনে যা কামাই করি, তাতে ভাড়াই ওঠে না।
ট্রাকচালক মো. রফিক বলেন , রাতেও জ্যাম লেগে থাকে। মালামাল নামাতে বা তুলতে দেরি হলে, গন্তব্যে পৌঁছাতে পুরো দিন চলে যায়।
সিটি করপোরেশনের কেসিসির সম্পত্তি শাখার র্কমর্কতা গাজী সালাউদ্দিন জানান, সিটি করপোরেশন নিয়মিত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিরসনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এদিকে খুলনার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চরম দুরবস্থায়। ১৫ বছর আগে স্থাপিত সিগন্যাল লাইটগুলো গত ছয় বছর ধরে অকেজো। ফলে ম্যানুয়ালি যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল ইমরান হোসেন বলেন, আমাদের নির্দেশ অনেকেই মানছে না । ফলে যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। অনেকে নির্দেশ না মেনে চলে, এতে জ্যাম আরও বেড়ে যায়।
কনস্টেবল আরিফুল ইসলাম বলেন ,দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। লোকবল কম, তাই ব্যস্ত সময়গুলোতে পুরো মোড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে । খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. কবির হোসেন বলেন ,যানজট নিরসনে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলছে। তবে লোকবল সংকটের কারণে সব এলাকাতে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খুলনার মতো ছোট শহরে সড়ক সংকটের মূল কারণ পরিকল্পনার অভাব। সড়ক উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পার্কিং জোন ও গণপরিবহন; সবকিছু নিয়ে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ না করলে এই দুরবস্থা কাটবে না। খুলনার সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ এবং সড়ক বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, খুলনা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে যান্ত্রিক এবং অযান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা যোগফলে একটি বিপুল সংখ্যক গাড়ির চলাচল শহরের সড়কগুলোতে যানজট সৃষ্টি করছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নগরীর সিংহভাগ যানজট সৃষ্টিতে নগর ট্রাফিক বিভাগের গাফিলতি রয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের চোখের সামনে এবং তাদের নাকের ডগায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনুমোদনহীন ইজিবাইক, থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। মাঝেমধ্যে নামমাত্র অভিযানের নামে সামান্য কিছু জরিমানা আদায় করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে চলাফেরা করছে। এক সময়ে নগরীতে সকাল ৮ টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাস-ট্রাকও লরী প্রবেশ ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু বর্তমানে অবাধেই চলছে বাস-ট্রাক ও লরি। অবশ্য এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বর্তমান ট্রাফিকের ডেপুটি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠো যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অফিসে আসুন, বিস্তারিত বলা যাবে’।

