বিপ্লব সাহা খুলনা ব্যুরো:
খুলনা শহরসহ বাগেরহাট সুন্দরবন ও দক্ষিণ অঞ্চলের বিশেষ কয়েকটি জেলার সাথে সংযোগের অন্যতম মাধ্যম রূপসাঘাটে ট্রলার পারাপারের ক্ষেত্রে জীবন ঝুঁকির মধ্য উভয়পারের যাত্রী,
তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে গ্যাংওয়ে দু’টি, যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে পারাপারের যাত্রীদের ক্ষেত্রে মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে । ভুক্তভোগী যাত্রীসহ ট্রলার মাঝিদের অভিযোগ গ্যাংওয়ের অধিকাংশ স্থান মরিচা ধরে ছোট-বড়ো গর্ত হওয়া পারাপারের হাজার হাজার যাত্রীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ঝুকিপূর্ণ গ্যাংওয়ের উপরে কাঠের চালি দিলেও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। চলাচলের সময় মূল্যবান জিনিস নদীতে পড়ে যাচ্ছে। আবার কখনও খানা খন্দে পড়ে জখম ও আঘাতপ্রাপ্ত হয় অনেকে। একাধিকবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনো লাভ হয়নি বলে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ। গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘাটের মালিকানা পরিবর্তন ও টোলের হার দ্বিগুণ করা হলেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগে রূপসা ঘাটের দায়িত্ব ছিল খুলনা সিটি কর্পোরেশনের। ওই সময় জনপ্রতি নেওয়া হতো এক টাকা, মোটরসাইকেল ছিলো ৫টাকা। সরকার পতনের পর থেকে ঘাটের দায়িত্ব নেয় বিআইডব্লিউটিএ। মাসভিত্তিক ইজারা নিয়ে ঘাট পরিচালনা করতে থাকে আলী আকবর নামে এক ব্যক্তি। ২১ মাস দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি এ ঘাটে পন্টুন দেওয়া হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের গ্যাংওয়ে দু’টি রয়েছে ভাঙা-চোরা জরাজীর্ণ অবস্থায়। ঘাটের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নসহ টোল আদায় স্বাভাবিক রাখার জন্য সাধারণ যাত্রী থেকে এলাকাবাসী প্রতিবাদ করেও কোন সুরাহা মেলেনি। এমন কী খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল নির্বাচনের আগে ঘাটের সমস্যা সমাধানসহ টোলমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
উপজেলার দেবীপুরের রূপসা গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক শরমীন সুলতানা বলেন, গ্যাংওয়ের কারণে পারাপারে ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে। কর্মজীবী নারী হয়ে প্রতিদিন সকালে দৌড়ে পার হতে হয়। ঘটের টোল আদায়কারী ব্যক্তিদের ব্যবহার ব্যাপক বাজে। তারা মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। যেটি খুব খারাপ। গত দু’দিন আগে পার হওয়ার সময় পড়ে গিয়ে হাঁটুতে ব্যথা পায়। প্রতিদিন কোনো না কোনে দুর্ঘটনা ঘটে।
পূর্ব রূপসার বাসিন্দা আলকাজ বলেন, ‘খুলনা শহরের একটি ইলেকট্রিক দোকানে চাকরি করি। গ্যাং ওয়ের ওপর রাখা কাঠের তৈরি তখতা সরে গেলে নদীতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে পাশ থেকে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি ধরে ফেলে। না হলে নদীতে পড়ে যেতাম। এ ঘটনায় পকেট থেকে মোবাইল ও মানিব্যাগ নদীতে পড়ে যায়। মানিব্যাগ উদ্ধার করা গেলেও মোবাইলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে কর্মস্থলে যেতে যাই। এটা আমাদের রূপসার গ্যাং ওয়ের নিত্যদিনের চিত্র। পূর্ব রূপসা এলাকার বাসিন্দা হযরত আলী জানান, ‘চলাচলে ব্যাপক সমস্য হয়। পরিস্থিতি ব্যাপক খারাপ। তাছাড়া ঘাটের টোল এক টাকার স্থলে দু’টাকা দেওয়া হলেও যাত্রীদের সেবার মানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়না।’
টোল আদায়কারী কুদ্দুস শেখ জানান, ‘২১ মাস দায়িত্ব নিয়েছি। তার আগে থেকে গ্যাংওয়েটি ভাঙা ছিল। বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়টি নিয়ে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। গ্যাংওয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হবে। নির্মাণের খরচ পড়বে ২ কোটি ৭ লাখ টাকা বলে জানতে পেরেছি। ইতোমধ্যে ঘাটে নতুন দু’টি পন্টুন দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
তিনি আরও জানায়, ‘প্রায় এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের ক্ষতি পূরণ দিতে হয় মাঝেমধ্যে। পশ্চিম পাশের থেকে পূর্ব পাশের গ্যাংওয়েটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। যাত্রীদের চলাচলের জন্য নিজেদের উদ্যোগে কাঠ দিয়ে বড়ো বড়ো ফাঁকা স্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
খুলনা বিআইডব্লিউটিএ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রিদ্দি রুবায়েত বলেন, ‘গ্যাংওয়ের জন্য বাজেট তৈরি করে হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে। আগে টাকা ছিল না এখন টাকা পেয়েছি। প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। গত ৩ মে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। খুব শিগগ্রই কাজ শুরু হবে। খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল বলেন, ‘ইজারাদার আকবরকে বিআইডব্লিউটি-এর কিছু কর্মকর্তার আর্থিক সুবিধার এক মাস পর পর কয়েকটি ঘাটকে রিনিউ করে দেয়। নৌকার ভাড়া ৪/৫ টাকা থাকলেও ঘাটের ভাড়া ২টাকা একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানার চেষ্টা করেছি। এটা বিআইডব্লিউটি-এর নির্ধারিত ভাড়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়ে ওপেন টেন্ডারের দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। অন্যান্য ঘাটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। পশ্চিমঘাটের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। খুলনা -২ আসনের এমপি ও মেয়রকে বিষয়টি বলেছি। তিনি আরও বলেন, পূর্ব রূপসা ঘাটের গ্যাংওয়ের অবস্থা নাজুক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তারা গ্যাংওয়ে না দিলে তা খুব শিগগ্রই মেরামত করা হবে।

