আব্দুল্লাহ আল মামুন পিন্টু,টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধিঃ
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর টাঙ্গাইলে সম্প্রতি যোগদানকারী হিসাব সহকারি মোঃ মোফাজ্জল হোসেন। ইতিপূর্বে ক্লার্ক কাম টাইপিস্ট (সিসিটি) পদে (তৃতীয় শ্রেণি) জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) চাকরিরত ছিলেন। প্রতিবন্ধী কোটায় চাকরি নেওয়া মোফাজ্জল ‘বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামের একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তেলবাজির কারণে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। দিনদিন তার প্রভাব এতই বেড়েছিল যে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ‘মোফাজ্জল গং’-এ অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন।
প্রতিনিয়ত তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বদলিসহ ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলো। এক সময়, ডিপিএইচই’র সব দপ্তরে মাফিয়া মোফাজ্জলের কারনে কোণঠাসা ছিলো কর্মকর্তারা! অভিযোগ আছে, মোফাজ্জলকে টিকিয়ে রাখতে সবসময়ই সহযোগিতা করতেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। ডিপিএইচই’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্টাফদের কাছ থেকে জানা যায়, বিগত কর্মস্থলে মোফাজ্জলের চাকরি সিসিটি পদে হলেও নিজ পদের কোনো কাজ করতেন না। সিসিটি’র কোনো কাজ না করে তিনি কর্মচারীদের দাবি আদায়, ঘুষ ও বদলি বাণিজ্যে ব্যাপক মনোযোগী ছিলেন। তিনি মূলত দাবি আদায়ের আড়ালে তদবির, ঘুষ, চাঁদাবাজি, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। সরকারি বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ব্লাকমেইলের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মোফাজ্জল গং। যেকোনো কর্মচারী অপরাধ করে অফিসিয়ালি শাস্তি পেলেও মোফাজ্জল অদৃশ্য শক্তিতে পার পেয়ে যান। ইতিপূর্বে প্রধান প্রকৌশলী থেকে শুরু করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের নানাভাবে হুমকি-ধামকি ও ব্ল্যাকমেইল করে শাস্তি পাওয়া কর্মচারীদের পদোন্নতিও পাইয়ে দিতেন আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহারকারী মোফাজ্জল।
মোফাজ্জলের পাশাপাশি নানা অভিযোগে অভিযুক্ত তারই ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত ছিলেন, প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের উচ্চমান সহকারী সৈয়দ মো. ইকরামুল হক। মোফাজ্জলের তদবির, ঘুষ, গুরুত্বপূর্ণ চিঠি সাপ্লাই, চাঁদাবাজি ও বদলি বাণিজ্যের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তিনি।
মোফাজ্জলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে,
শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ চেষ্টা ও অনৈতিক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০২০ সালে ৪ সেপ্টেম্বর ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের সম্মিলিত অধিকার আদায় ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ কৈফিয়ত চেয়ে চিঠি দেয় মোফাজ্জলকে। চিঠিতে সই করেন সংগঠনের সভাপতি মো. মিরাজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসান। চিঠিতে বলা হয়, ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট মোসাম্মদ ফারহানা পারভিন (সহ-মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা, কেনিফ) আপনার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ চেষ্টা ও অনৈতিক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে একই বছর ৪ সেপ্টেম্বর মোফাজ্জলকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সংগঠনের সকল কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
২০২০ সালে নেত্রকোণা কেন্দুয়া উপজেলার রয়েলবাড়ি ইউনিয়নের এস এম সালেহীন স্থানীয় সরকার বিভাগে মোফাজ্জলের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ ফজলে আজিমের সই করা এক চিঠি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে।
২০২২ সালে বোরকা পরে ক্যাশিয়ার পদে স্ত্রীর পরীক্ষা দিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন বরিশালের সিসিটি আশরাফ হোসেন। এরপর তাকে সাসপেন্ড করা হয়। কিন্তু মোফাজ্জলের চাপে পড়ে সেই আশরাফকে সিসিটি থেকে সরাসরি ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব দিয়ে ঝালকাঠিতে বদলি করে ডিপিএইচই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে মোটা অঙ্কের লেনদেন করেছে মোফাজ্জল। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সিসিটিকে ক্যাশিয়ার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বদলি করিয়েছেন তিনি। সিসিটি থেকে সরাসরি ক্যাশিয়ার পদে পদায়ন করায় ক্ষোভ বিরাজ করছে মূল ক্যাশিয়ারদের মাঝে। এমন বদলির প্রতিবাদ জানিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেনের কাছে চিঠি দিয়েছিল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ক্যাশিয়ার ফোরাম নামের একটি সংগঠন।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি মাসে মোফাজ্জলের ঘুষ বাণিজ্য ও প্রতারণার শিকার হয়ে জনস্বাস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দেন সাহেদ আলম নামের এক ব্যক্তি। ভুক্তভোগী চিঠিতে উল্লেখ করেন, পাবলিক হেলথের এক কর্মীর মাধ্যমে মোফাজ্জলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেই সুবাদে সিসিটি মোফাজ্জলের আশ্বাসে আমার নিজ জেলায় সিসিটি পদে (মাস্টার রোল) চাকরি পাইয়ে দিতে চার লাখ টাকা চুক্তি হয়। এরপর মোফাজ্জলের নির্দেশনায় তিন লাখ টাকা প্রধান প্রকৌশলী ‘বড় বাবু’ সৈয়দ ইকরামুল হকের শেওড়াপাড়ার বাসায় গিয়ে দিয়ে আসি। বাকি এক লাখ টাকা কাজ হয়ে গেলে দিতে হবে বলে জানান ইকরামুল হক। মোফাজ্জলের সঙ্গে ইকরামুল হকের ঘনিষ্ঠতা আছে এবং মোফাজ্জলের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়ে আমি ইকরামকে টাকা দিই। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী অবসর চলে যাওয়ার পরের দিন মোফাজ্জল বলেন, সাইফুর স্যার কোনো চাকরির সিভিতে সই করেননি। কিছুদিন অপেক্ষা করেন নতুন প্রধান প্রকৌশলী সরোয়ার স্যার চেয়ারে বসলে সময় মতো সবগুলোন পারমিশন করিয়ে আনব। পরে জানতে পারি মাস্টার রোলে চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তখন টাকা ফেরত চাইলে বলেন, টাকা ফেরত হবে না। আমি টাকা চেয়ে জোর দিলে আমাকে হুমকি-ধামকিও দেয়। ইকরামুল হকও বলেন, অপেক্ষা করেন চাকরি হবে, টাকা ফেরত হবে না। এমন অনেকের কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে মোফাজ্জল ও তার অবৈধ কাজের সহযোগী ইকরামুল।
বিগতবছরে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ডিপিএইচই ভবনের সামনে একটি ব্যানার টানানো হয়। সেই ব্যানার ইচ্ছা করে খোলার অভিযোগ এনে ভবনে তুলকালাম কাণ্ড করেন মোফাজ্জল ও তার সহযোগীরা। ওই ঘটনায় ফেসবুকে লাইভ করে বঙ্গবন্ধুর নামে স্লোগান দিয়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর রুমে দলবল নিয়েও প্রবেশ করেছিলেন মোফাজ্জল গং। যা চাকরি বিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এরপর ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছুলেন তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান।
তৎকালীন কমিটির প্রধান প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেন বলেছিলেন, ‘ওই ব্যানার কেউ ইচ্ছা করে খোলেনি। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তাণ্ডবে সেটি পড়ে যায়। অন্যকিছু নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীরা বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মোফাজ্জল ও ইকরামের এমন চাঁদাবাজির কথা ওপেন সিক্রেট ছিলো, দেশবাসীর জানে, কারণ বিভিন্ন পত্রিকা ও মিডিয়াতে নিউজ হয়েছিল। তারপরও তাদের বিরুদ্ধে অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। মোফাজ্জল প্রভাব খাটিয়ে অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজের লোকদের বসিয়েছিল। এতে করে অফিসারদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষদের ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ এর বিধি ২২ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ছাড়া নিজের দায়িত্ব ব্যতীত কোনো টেলিভিশন ও পত্র/পত্রিকায় বক্তব্য দিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি প্রতিনিয়ত কর্মচারী বিধিমালা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন পত্র/পত্রিকা ও টিভিতে বক্তব্য দিতেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপিএইচই’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমানকে ব্ল্যাকমেইল করে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের প্রধান সহকারীর দায়িত্ব নেন মোফাজ্জলের কুকর্মের সহযোগী ইকরাম। এর আগে তিনি ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ছিলেন। মূলত এখান থেকে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের গোপনীয় তথ্য মোফাজ্জলকে সরবরাহ করতেন ইকরাম। এরপর শুরু হতো কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইলিং ও নীরব চাঁদাবাজি। তাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ট হতো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ সব বিষয়ে জানতে, ওই মোফাজ্জল হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।