লোহাগড়া প্রতিনিধি নড়াইল
তথ্য পাওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার থাকলেও নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে প্রায় তিন মাসেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাননি সাংবাদিকেরা। দীর্ঘ সময় পর যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নথির ঘাটতি। এতে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মে লোহাগড়া উপজেলা পিআইও কার্যালয়ে ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সরকারের বরাদ্দ দেওয়া টিআর, কাবিখা, কাবিটা, জিআর ও খাল খনন প্রকল্পের তালিকা,থোক বরাদ্দ, এমপির বিশেষ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয়।
তবে আবেদন করার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যালয় থেকে তথ্য দেওয়ার বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন আবেদনকারীরা সাংবাদিকরা, তাঁদের অভিযোগ, প্রথম পর্যায়ে তথ্য অধিকার আইনের আবেদন ফরম গ্রহণ করতেই অনীহা দেখানো হয়।
আবেদনকারীদের দাবি, লোহাগড়া পিআইও কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক অভিজিৎ কুমার মণ্ডল প্রথমে তাঁদের আবেদন নিতে চাননি। এ সময় অভিজিৎ একজন সাংবাদিককে টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর লোহাগড়া পিআইও কার্যালয়ের প্রকৌশলী মো. অলিউল্লাহ পিআইওর নির্দেশে তথ্য অধিকার আইনের আবেদনটি গ্রহণ করেন। এরপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়ায় সাংবাদিকেরা কম পক্ষে ১০ বার কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রতিবারই তাঁদের বিভিন্ন ধরনের টালবাহানার মুখে পড়তে হয়েছে। একপর্যায়ে প্রকৌশলী মো. অলিউল্লাহ বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। এমনকি সংসদ সদস্যের বরাদ্দসংক্রান্ত তথ্য নিতে হলে সংসদ সদস্যের অনুমতি প্রয়োজন বলেও তিনি জানান। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নে তথ্য অধিকার আইনে প্রায় তিন মাস আগে আবেদন করা হয়েছে, তাহলে এখন কেন সংসদ সদস্যের অনুমতির প্রয়োজন হবে? এ ধরনের কোনো বিধান কোন আইনে রয়েছে, সে বিষয়েও জানতে চান তাঁরা। তবে এরপরও তথ্য দিতে বিলম্ব কারন জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেন নাই। পরে বিষয়টি লোহাগড়ার নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মুস্তাফিজুর রহমানকে অবহিত করেন সাংবাদিকেরা। তাঁদের দাবি, ইউএনও বিষয়টি জানার পর তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও পিআইও কার্যালয় থেকে তাঁদের চাওয়া সব তথ্য দেওয়া হয়নি। পরে আংশিক কিছু তথ্য ও নথি সরবরাহ করা হয়।
সরবরাহ করা নথি পর্যালোচনা করে সাংবাদিকেরা দাবি করেন, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, মূল বরাদ্দ, বরাদ্দের খাত, প্রকল্পভিত্তিক অর্থের পরিমাণ ও সুবিধাভোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্যসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেখানে নেই। ফলে সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, আবেদনকারীর চাহিদা অনুযায়ী তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করার বিধান রয়েছে। তথ্য দিতে অপারগ হলে তার কারণও আবেদনকারীকে জানানোর কথা। ফলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পর প্রায় তিন মাস সময় পার হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা কিংবা দিতে বিলম্ব করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়নে কোনো অনিয়ম থাকলে তা আড়াল করতেই তথ্য দিতে দীর্ঘসূত্রতা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক অভিজিৎ কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকৌশলী মো. অলিউল্লাহর কাছ থেকেও তথ্য দিতে বিলম্ব, সংসদ সদস্যের অনুমতির কথা বলা এবং আংশিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, তথ্য অধিকার আইন সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্যই প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার পরও যদি আবেদনকারীকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ নথি দেওয়া হয়, তাহলে তা তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাংবাদিকেরা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি কেন নির্ধারিত সময়ে তথ্য দেওয়া হয়নি এবং কেন অসম্পূর্ণ নথি সরবরাহ করা হয়েছে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

