বিপ্লব সাহা খুলনা ব্যুরো:
গত পাঁচ মাসে ৩৫ খুন মূল পরিকল্পনাকারীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে,
গত কাল খুলনা নগরীর গল্লামারী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে রফিকুল ইসলাম মানিক নামে এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী আহত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মো রফিকুল ইসলাম জানান, গল্লামারী এলাকার আইডিয়াল নার্সিংহোমের সামনে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে করে আসা একদল যুবক হঠাৎ রফিকুল ইসলাম মানিককে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
এতে একটি গুলি তার পেটে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
স্থানীয়রা আহত মানিককে দ্রুত উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গুলির ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে হামলার কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এ বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মো রফিকুল ইসলাম জানান, এই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে সনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। আগে সন্ধ্যা হলেই আতঙ্ক বাড়তে থাকতো খুলনায়। খুলনায় ২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে সন্ধ্যা নামলেই ঘটতো খুনের ঘটনা। আতঙ্কের নগরী ও জেলার বাসিন্দারা থাকতেন শংকিত। কিন্তু ২৬ সালের গত পাঁচ মাসে এখন প্রকাশ্যদিবালোকে ঘটছে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যাকান্ডের ঘটনা।
গত পাঁচ মাসে খুলনা জেলায় ৩৫ জনকে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা নগরীতে ১৫ জনকে এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। অধিকাংশ খুনের ঘটনা ঘটেছে মাদককান্ডে এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। শুধু নির্বাচন পরবর্তীতে খুলনা নগরীতেই ১০ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের সুত্রে জানাযায়, প্রায় প্রতি রাতেই খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ও নগরীর কোথাও না কোথাও সন্ত্রাসী হামলার খবর পাওয়া যায়। গুলি করে অথবা কুপিয়ে ফেলে যাওয়া হচ্ছে ছাত্র, রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীকে। গত ৫ মাসে খুলনা নগরী ও জেলায় শতাধিক ছোটবড় সন্ত্রাসী হামলায় খুন হয়েছেন ৩৫ জন। সর্বশেষ খুলনা মহানগরীর লবনচরা থানার বটিয়াঘাটার কাজিপাড়া মাথাভাঙা এলাকায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে প্রকাশ্যদিবালোকে দুপুর সাড়ে ১২ টায় হেলমেট পরিহিত তিন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেল যোগে এসে টার্গেট করে পেটে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।
তার আগে খালিশপুর থানার নয়াবাটি এলাকায় তাতীদলের ওয়ার্ড সভাপতি ও মুদি দোকানদার সোনা মিয়াকে কুপিয়ে খুন করে প্রতিপক্ষের দুর্বৃত্তরা। এর আগে নগরীর দৌলতপুর থানার কেডিএ মার্কেটে ব্যবসা প্রতিষ্টানে থানা যুবদল নেতা রাশিদুল ইসলাম রাশুকে মটরসাইকেল যোগে এসে একদল ৪/৫ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী উপুর্যুপরি তিন/ চারটি গুলি করে হত্যা করে চলে যায়। তার আগে রোজার প্রায় শেষে ঈদের কয়েকদিন আগে নগরীর ডাকবাংলা এলাকায় সন্ধ্যায় রুপসা উপজেলা শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে খুলনার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা।
পুলিশ ও বিভিন্ন সুত্রে জানাগেছে, এর আগে দৌলতপুরের আরেক যুবদলের সাবেক নেতা মাহাবুবুর রহমান মাহাবুবকে তার নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে ও গুলি করে নৃশংস্য ভাবে খুন করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। খুলনার বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এই সকল হত্যাকান্ডের এখনো কোন সঠিক তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় হতাশ ও উদ্বিগ্ন রয়েছে বলে খুলনার একাধিক নেতাও কর্মীরা জানিয়েছেন।
তবে তারা নাম প্রকাশ করতে অনিহা প্রকাশ করেন। তার আগে অর্ণব কুমার সরকার নামের খুলনাবিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এখন পর্যন্ত এ সকল হত্যা গুলোর সঠিক কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ।
তবে কেএমপি পুলিশ তিনটি সম্ভাব্য কারণকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তা হচ্ছে মাদক বেচাকেনা ও ভাগবাটোয়ারা, স্থানীয় আধিপত্য এবং দলীয় কোন্দলের কারনে এ সকল হত্যাকান্ড গুলো ঘটছে বলে কেএমপির মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার মো: আব্দুর রাজ্জাক জানান। কেএমপির এডিশনাল পুলিশ কমিশনার বলেন, খুলনা নগরীতে চার-পাঁচটি সন্ত্রাসী গ্রুপ এ সকল হত্যা ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িত রয়েছে।
তাদের অনেক সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে। কিন্ত কিছুদিন পর আবারো তারা জামিনে বের হয়ে এসে আবারো জড়িয়ে পড়ছে অপরাধের সাথে। খুলনার এই সকল হত্যা মিশনে খুলনার তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় ভাবে অংশ নিচ্ছে। খুলনা জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেন শুভ জানান, অধিকাংশ হত্যার সাথে স্থানীয় ও পারিবারিক দন্দ, জমি-জমা সংক্রান্ত ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। প্রায় সব গুলো হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের মধ্যে থেকে অধিকাংশ জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খুলনার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় স্থানীয়রা এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা নিখুঁত ভাবে ও টার্গেটের ব্যাক্তিদের লক্ষ্য করে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করে নির্বিঘ্নে চলে যায়। পুলিশ এ সকল হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে প্রায় ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে কেএমপি বিভিন্ন থানার পুলিশ।
তবে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত মুল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা এবং মুল হত্যাকারীরা রয়েগেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে খুলনার জনমানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
কেএমপি পুলিশ এই পাঁচ মাসে দেশী-বিদেশী প্রায় ১৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। কেএমপির মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী খুলনা মহানগরীতে খুন হয়েছে ১০ টি বলে পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে জানাগেছে।

